বৌলাই ইউনিয়নের নামকরণের সাথে জড়িয়ে আছে প্রেম, মুঘল সাম্রাজ্যের বিস্তার, পর্তুগিজ জলদস্যু, বারো ভূইয়া এবং নৌঘাঁটির ইতিহাস। তবে সবকিছুকে ছাপিয়ে এখানে এক হিন্দু-মুসলিম প্রেমকাহিনী চিরস্মরণীয় হয়ে আছে।
করিম খাঁর আগমন
আনুমানিক ১৬১১-২০ খ্রিস্টাব্দে মুঘল সম্রাট জাহাঙ্গীরের শাসনামলে আমিরুল বহর করিম খাঁ (পিতা: শেখ জামাল উদ্দীন) বাগদাদ থেকে উত্তর ভারত হয়ে বাংলায় আসেন। তাঁর নামানুসারেই আজকের করিমগঞ্জ নামকরণ।
তিনি কিশোরগঞ্জ শহরের অদূরে ব্রহ্মপুত্র নদের উপনদী নরসুন্দার পাড়ে দুর্গসদৃশ আবাস গড়ে তোলেন। এ স্থানই পরবর্তীতে পরিচিত হয় পুরান বৌলাই নামে।
মুঘল নৌঘাঁটি
সেই সময়ে বাংলার নদীপথে পর্তুগিজ জলদস্যুরা ত্রাস ছড়াচ্ছিল এবং ঈসা খাঁর পুত্র মুসা খাঁ নৌযুদ্ধে মুঘলদের চ্যালেঞ্জ দিচ্ছিলেন। তাঁর প্রধান ঘাঁটি ছিল জঙ্গলবাড়ি দুর্গ। এ কারণে নরসুন্দার অপর পারে পুরান বৌলাইয়ে করিম খাঁর অধীনে একটি মুঘল নৌঘাঁটি স্থাপন করা হয়।
প্রেম ও নামকরণ
কালের প্রবাহে করিম খাঁর ৬ষ্ঠ প্রজন্মে জন্ম নেন শেখ মোহাম্মদ মুনীর। তিনি প্রেমে পড়েন পার্শ্ববর্তী সুবন্দী গ্রামের জমিদার বিজয় কৃষ্ণের সুন্দরী কন্যার।
কন্যার বিয়ের দিন মুনীর পেয়াদা-বরকন্দাজ নিয়ে সরাসরি বিয়ের আসর থেকে কনেকে তুলে আনেন। গ্রামবাসীরা অবাক হয়ে জানতে চায়—কি হচ্ছে? উর্দুভাষী বরকন্দাজরা বলে ওঠে,
“সাহাবজাদানে বহুলায়ী” — অর্থাৎ সাহেবের ছেলে বৌ নিয়ে এসেছেন।
এই “বহুলায়ী” শব্দই পরবর্তীতে উচ্চারণে বিবর্তিত হয়ে আজকের “বৌলাই” হয়েছে। বাংলা ধ্বনিতত্ত্ব
অনুযায়ী, বহুলায়ী
→ বুলায়ী/বুলাই (স্বরসঙ্কোচন) → বৌলাই (আঞ্চলিক রূপান্তর ও সঙ্কোচন) শব্দের
উৎপত্তি বলে ধরে নেওয়া হয়।
প্রেমের পরিণতি
জমিদার বিজয় কৃষ্ণ ধর্মের অজুহাতে মেয়েকে ফেরত চান। ন্যায়পরায়ণ পিতা শেখ মোহাম্মদ করিমের নির্দেশে মুনীর শেষ পর্যন্ত প্রিয়তমাকে ফেরত পাঠান। এরপর তিনি বর্তমান দক্ষিণ রাজকুন্তিতে নতুন বাড়ি নির্মাণ করে বসবাস শুরু করেন। এ বাড়িই আজ “বৌলাই সাহেব বাড়ি” নামে খ্যাত। আর পুরোনো বাড়ি পরিচিত হয় “পুরান বৌলাই” নামে।
গবেষণা ও সংকলন: মাহফুজুর রহমান সোহাগ
তথ্যসূত্র:
১। বৌলাই বাড়ির ৪০০ বছর
২। কিশোরগঞ্জ ডট কম
৩। উইকিপিডিয়া
৪। বাংলাপিডিয়া
৫। সরকারি পোর্টাল, নিউজ সাইট, ব্লগ সাইট, বৌলাইয়ের প্রবীণ সমাজ।


No comments:
Post a Comment